পার্থেনিয়াম: ভয়ংকর আগ্রাসী আগাছা

শিরাযুক্ত ও নরম কাণ্ডবিশিষ্ট একবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় আগাছার নাম পার্থেনিয়াম। “পার্থেনিয়াম” শব্দটি ইংরেজি হলেও এর উৎপত্তি গ্রিক শব্দ parthenos থেকে, যার অর্থ “কুমারী”। এটি উদ্ভিদের একটি প্রাচীন নাম। এ আগাছাটি কংগ্রেস ঘাস, গাজর ঘাস, চেতক চাঁদনী, র‍্যাগ উইড, হোয়াইট টপ, হোয়াইট হেড ও স্টার উইড নামেও পরিচিত।

উদ্ভিদজগতে এটি কম্পোজিট বা Asteraceae পরিবারভুক্ত। এই গণে প্রায় ১৬টি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত প্রজাতি হলো Parthenium hysterophorus। বাংলাদেশে যে পার্থেনিয়াম দেখা যায়, তার বৈজ্ঞানিক নাম Parthenium hysterophorus এবং এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।


বিস্তারের ইতিহাস

পার্থেনিয়ামের আদি নিবাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং উত্তর-পূর্ব মেক্সিকো। বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণ অঞ্চল এবং আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে এর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। কেনিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার কফি চাষের জমিতেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে।

ভারতে এর বিস্তারের ইতিহাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সালের দিকে খাদ্য সহায়তার অংশ হিসেবে আমদানিকৃত গমের সঙ্গে পার্থেনিয়ামের বীজ ভারতে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে তা বাংলাদেশসহ সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে এ আগাছা শনাক্ত করা হয়।


বৈশিষ্ট্য

পার্থেনিয়াম একটি খাড়া, অধিক শাখাবিশিষ্ট হার্বজাতীয় উদ্ভিদ। এর পাতা খাঁজযুক্ত এবং দেখতে অনেকটা চন্দ্রমল্লিকা পাতার মতো। গাছের উচ্চতা সাধারণত ০.৫–১.৫ মিটার, তবে অনুকূল পরিবেশে ২ মিটার বা তার বেশি হতে পারে।

রোপণের এক মাসের মধ্যেই ফুল ফোটে এবং বছরের যেকোনো সময় ফুল ধরতে পারে, তবে বর্ষাকালে বেশি দেখা যায়। ফুল ছোট ও সাদা রঙের। বীজ পরিপক্ব হলে হালকা বাদামি হয়।

মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর বিস্তার বেশি লক্ষ করা যায়। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে ১০–২৫ হাজার পর্যন্ত বীজ উৎপন্ন হতে পারে। বীজ হালকা ও প্যারাসুটের মতো হওয়ায় পানি, বাতাস, পশুপাখি, যানবাহন, কৃষিযন্ত্র, পোশাক, কাদামাটি ও দূষিত কৃষিপণ্যের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।


অর্থনৈতিক গুরুত্ব

উপকারিতা

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, P. hysterophorus পাউডার ভারী ধাতু যেমন ক্যাডমিয়ামযুক্ত দূষিত পানি পরিশোধনে শোষক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আবার ১৪ দিন পচিয়ে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করলে মাটির নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম বৃদ্ধি পায়।

তবে এসব সীমিত উপকারিতার তুলনায় এর ক্ষতিকর প্রভাব বহুগুণ বেশি।


অপকারিতা

পার্থেনিয়ামের পুরো গাছই ক্ষতিকর, বিশেষ করে ফুলের রেণুতে থাকা Sesquiterpene Lactones (SQL) জাতীয় বিষাক্ত উপাদান— যেমন পার্থেনিন, হাইমেনিন, হাইস্টেরিন ও করোনোপিলিন। এছাড়া ক্যাফেইক এসিড ও পি-অ্যানিসিক এসিডের মতো বিষাক্ত রাসায়নিকও এতে বিদ্যমান।

এ আগাছার আক্রমণে ফসলের ফলন ৪০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। মাটির নাইট্রোজেন আবদ্ধকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। আলু, বেগুন, টমেটো, কলা ও আখের ক্ষেতে এর প্রভাব বেশি।

গবাদিপশু এটি খেলে মুখ ও পরিপাকতন্ত্রে ঘা, যকৃতে ক্ষতি এবং দুধ উৎপাদন কমে যেতে পারে। মহিষ, ঘোড়া, গাধা, ভেড়া ও ছাগলও আক্রান্ত হয়।

মানুষের ক্ষেত্রে ফুলের রেণু শ্বাসনালীতে প্রবেশ করলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও জ্বর হতে পারে। ত্বকে সংস্পর্শে এলে এলার্জি, চর্মরোগ ও একজিমা দেখা দেয়।


ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিল মাসে উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে দ্রুত এর বিস্তার শুরু হয়, বিশেষ করে কলার বাগান, সবজি ক্ষেত ও খালি জায়গায়। দ্রুত দমন না করলে আশপাশের এলাকা দখল করে নেয়।

রেললাইন, কবরস্থান, ইটভাটা ও মহাসড়কের পাশে এর বিস্তার বেশি দেখা যায়। তাই সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

  • জমি খালি না রেখে নিয়মিত ফসল আবাদ করতে হবে।

  • আগাছা ছোট অবস্থায় তুলে ফেলতে হবে।

রাসায়নিক দমন

  • ২–৩ পাতা অবস্থায় প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি গ্লাইফোসেট মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

  • অথবা গ্লাইফোসেট (২৪%) + ২,৪-ডি (১২%) প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে প্রয়োগ করা যায়।

জৈবিক দমন

  • Puccinia melampodii (রাস্ট রোগ) দ্বারা প্রায় ৭০% পাতা ধ্বংস করা সম্ভব।

  • Zygogramma bicolorata বিটল পোকা পাতাভক্ষণ করে প্রায় ৮৫% পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
    জৈবিক পদ্ধতি ফসলের জন্য নিরাপদ।


সতর্কতা

পার্থেনিয়াম দমনের সময় অবশ্যই রাবারের গ্লাভস, মাস্ক, সম্পূর্ণ পোশাক ও জুতা পরিধান করতে হবে। কাজের সময় ধূমপান করা যাবে না।


আপনি চাইলে এটি সংবাদ প্রতিবেদন, লিফলেট, পোস্টার বা সচেতনতামূলক বুকলেট আকারেও সাজিয়ে দিতে পারি।